বেপরোয়া গতি ও অদক্ষ চালকদের দাপটে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা, মালিকদের প্রভাবে আটকে যাচ্ছে বিচার
সন্দ্বীপের সড়কে এখন যেন একক আধিপত্য ট্রাকের। অনিয়ন্ত্রিত গতিতে, অদক্ষ চালকদের নিয়ন্ত্রণে এই পরিবহনটি দ্বীপজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ট্রাফিক ব্যবস্থার কার্যকর নজরদারি না থাকায় দিন-রাত সমানতালে চলছে বেপরোয়া গতি। এর ফলে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা, ঝরছে পথচারীর প্রাণ। স্থানীয়দের ভাষায়, ট্রাক এখন দ্বীপের মানুষের কাছে এক ধরনের “মৃত্যুযন্ত্র”।
রবিবার(৫ এপ্রিল) সরেজমিনে দেখা যায়, শিবেরহাট বাজার থেকে এনাম নাহার মোড় পর্যন্ত সড়কে ট্রাক চলছে অতিরিক্ত গতিতে। এই সড়কের দুই পাশে একাধিক স্কুল-কলেজ থাকলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে দিয়েও থামছে না গতি। ফলে শিক্ষার্থীসহ পথচারীদের মধ্যে বিরাজ করছে চরম আতঙ্ক।
অভিযোগ রয়েছে, ট্রাকের দাপট সবচেয়ে বেশি দেখা যায় রাতের বেলায়। বিশেষ করে মাটিখেকো চক্রের অবৈধ মাটি পরিবহনে ব্যবহৃত ট্রাকগুলো রাতভর সর্বোচ্চ গতিতে চলাচল করে। এতে অন্যান্য যানবাহনের চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে এবং প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত এক বছরে সন্দ্বীপে সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনার বড় একটি অংশই ট্রাকের কারণে ঘটেছে। সর্বশেষ গত সোমবার (৩০ মার্চ) পৌরসভা এলাকায় এক দিনমজুর শাহীন ট্রাকচাপায় নিহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, কাজের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার সময় দ্রুতগামী ট্রাক তাকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
এর আগে ২ মার্চ একই ধরনের ঘটনায় মোটরসাইকেল আরোহী আবদুল হান্নান প্রাণ হারান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তিনি মোটরসাইকেলে গন্তব্যে যাচ্ছিলেন। এ সময় পেছন থেকে দ্রুতগতির একটি ট্রাক তাকে চাপা দিলে তিনি গুরুতর আহত হন এবং পরে মারা যান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ট্রাক দুর্ঘটনার মূল কারণ হলো সড়কে আইনশৃঙ্খলার দুর্বল প্রয়োগ। অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক, নিয়ন্ত্রণহীন গতি এবং নিয়ম না মানার প্রবণতা দিন দিন পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
কেন থামানো যাচ্ছে না ট্রাকের এই দাপট?
সন্দ্বীপ২৪-এর অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনেক ট্রাক মালিকই স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা বড় ব্যবসায়ী। ফলে দুর্ঘটনার পরও ক্ষমতা ও অর্থের প্রভাবে অনেক ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া অবৈধভাবে মাটি কাটার কাজে ট্রাক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রশাসনের সঙ্গে ‘সমঝোতা’ বা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। ফলে ট্রাক চালকরা সড়কে বেপরোয়া আচরণ করলেও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা দেখা যায় না।
অন্যদিকে, দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারগুলো এখনো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত বলে অভিযোগ করেছে। তাদের দাবি, মামলা বা জিডি হলেও তা দীর্ঘ তদন্তের ফাঁকে ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে থাকে। ক্ষতিপূরণ তো দূরের কথা, ন্যূনতম সহানুভূতিও তারা পান না।
ফলে দ্বীপবাসীর এখন একটাই প্রশ্ন—আর কত প্রাণ গেলে থামবে এই বেপরোয়া ট্রাকের দাপট?